সর্বশেষ :

চাঁদপুর প্রতিনিধি :

ইলিশের বাড়ি খ্যাত চাঁদপুর শহরের রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। ব্রিটিশ আমলের শুরুর দিকে ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ জরিপকারী মেজর জেমস রেনেল তৎকালীন বাংলার যে মানচিত্র এঁকেছিলেন, তাতে চাঁদপুর নামক একটি জনপদের উল্লেখ ছিল। ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই চাঁদপুর তার কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে স্বকীয়তা ও ঐতিহ্যগত সুখ্যাতি ধরে রেখেছে। বহুকাল থেকেই চাঁদপুর প্রসিদ্ধ নানা কারণে। বাংলায় বারো ভূঁইয়াদের শাসনকালে এ জনপদ ছিল বিক্রমপুরের জমিদার চাঁদরায়ের অধীনস্ত। সে সময় থেকেই এ জনপদ সমৃদ্ধি লাভ করে।

মোলহেডে দাঁড়িয়ে নদীর দৃশ্য দেখা।

উত্তাল পদ্মা, মেঘনা আর খরস্রোতা ডাকাতিয়া- এই তিন নদী এসে মিলেছে চাঁদপুরে। তিন নদীর আগ্রাসন থেকে চাঁদপুর শহরকে রক্ষার জন্য তিন নদীর মিলনস্থল বা ত্রিবেণী সঙ্গমস্থলে নির্মাণ করা হয়েছে মোলহেড। ইংরেজি শব্দ মোলহেড (Molehead) মানে বিক্ষুব্ধ তরঙ্গ অভিঘাত হতে স্থল ভূমিকে রক্ষার জন্য পাথর-কংক্রিট দ্বারা নির্মিত শক্ত প্রাচীর বা বাঁধ। চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত এ মোলহেড নদীবিধৌত চাঁদপুরের শ্রেষ্ঠ নৈসর্গিক বিনোদন কেন্দ্র। এখানে প্রতিদিন বেড়াতে আসে হাজার হাজার মানুষ, আর উৎসবের দিনগুলিতে নামে লাখো মানুষের ঢল।

কর্মচঞ্চল মোলহেড, চাঁদপুর।

এই মোলহেড সংলগ্ন পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়ার সঙ্গমস্থল হলো বিশ্বজয়ী রূপালী ইলিশের উৎকৃষ্টতম প্রজনন ক্ষেত্র। প্রতি বছর সাগর থেকে উঠে আসা অসংখ্য মা ইলিশ এ মোহনায় এসে ডিম ছাড়ে এবং জাটকা থেকে কিশোর ইলিশ (খোকা ইলিশ) পর্যন্ত বৃদ্ধি এ মোলহেড সংলগ্ন ত্রি-মোহনাতেই ঘটে। তাই দেশের ইলিশ উৎপাদনে এ ত্রি-মোহনার গুরুত্ব অপরিসীম। আর ঠিক এ কারণেই এই জায়গার নাম দেওয়া হয়েছে ইলিশের বাড়ি। শুধু রূপালী ইলিশের ডিম পাড়া এবং বেড়ে ওঠার স্থান হিসেবেই নয়, এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও অতুলনীয়।

চাঁদপুরের তিন নদীর মোহনায় ইলিশ শিকার।

ভরা বর্ষায় পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়ার এ ত্রিবেণী সঙ্গমের জলরাশিতে বিশাল আকারের ঘূর্ণির সৃষ্টি হয়। সেসময় বড় বড় ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে এই মোলহেডে। এ সময়ে বিপুল জলরাশির ঘূর্ণন এবং নদীর তলদেশে তীব্র স্রোতের ফলে মোলহেডে ভ‚মিকম্পের মত কম্পন অনুভূত হয়।

বর্ষায় চাঁদপুর ত্রিবেণী সঙ্গমের রুদ্র রূপ।

শুকনো মৌসুমে শুকিয়ে যাওয়া নদীও যে কতখানি সুন্দর, তাও দেখা যায় এখানে বসেই। শান্ত নদীতে স্বচ্ছ জলরাশি, চলমান অসংখ্য যাত্রীবাহী নৌকা, লঞ্চ-স্টীমার এবং ছায়াঘেরা মোলহেড এক নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উৎসস্থল। ইলিশ ধরার জন্য জাল নিয়ে মাঝ নদীতে ছোট ছোট জেলে নৌকার বিচরণ, পড়ন্ত বিকেলে নদী থেকে ওঠে আসা মৃদুমন্দ বাতাস যে কাউকেই আবেশে বিহ্বল করে তোলে। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত সব বয়সী মানুষ দেহ-মনের ক্লান্তি জুড়াতে ছুটে আসে এখানে।

সকালে পূব আকাশের সূর্যের প্রথম আলোকচ্ছটা তিন নদীর সঙ্গমস্থলে ঢেউয়ের মাথায় পড়ে চিকচিক করে ওঠে। রঙিন হয়ে দোল খায় ঢেউয়ের তালে তালে। শেষ বিকালে সুপারি গাছের ফাঁক গলিয়ে আসা বিদায়ী সূর্যের রক্তিম আভায় উদ্ভাসিত এ মোহনা ধারণ করে ভিন্ন রূপ। বড় বিচিত্র আর অপূর্ব সে রূপ-মাধুর্য।

চাঁদপুরের ত্রিবেণী সঙ্গমে সূর্যাস্তের দৃশ্য।

মায়াবী সূর্যাস্ত দেখার আদর্শ একটি জায়গা হলো এই মোলহেড। তিন নদীর পানি দূর থেকেই আলাদা করে চেনা যায় এখানে। টুকটুকে লাল সূর্যটা যখন পশ্চিম আকাশে অস্ত যায়, তখন মনে হয় কে যেন নদীতে ছড়িয়ে গেছে। রং ছড়াতে ছড়াতে রঙের খনিটি নদীর অতলে হারিয়ে গেলেও এর রেশ থেকে যায় বহুক্ষণ ধরে।

স্রোতের উন্মাতাল কুলুকুলু মধুর শব্দে মন উদাস হয়ে যায়। চেনাজানা পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে যাওয়া সুপারি গাছের সৌম্য সারি ভাবালুতার জন্ম দেয় মনে। দূর থেকে ভেসে আসা কোনো মাঝির হাঁক শুনে মনে হয় এ যেন সাক্ষাৎ স্বর্গীয় ধ্বনি!

চাঁদপুর মাছের আড়তে ইলিশ বেচাকেনা।

মোলহেড থেকে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হলে অনেকগুলো ছোট ছোট বালু চরের দেখা পাওয়া যায়। এর অধিকাংশই অস্থায়ী,মাত্র কয়েক মাসের জন্য নদীর বুকে জেগে থাকে। তবে কিছু চর আছে স্থায়ী। ট্রলার কিংবা স্পিড বোটে এসব চরে যাওয়া যায়। গড়ে সময় লাগে ২০/২৫ মিনিট। মেঘনা নদীর বালুচরগুলোও দেখার মত। এই চর অনেকটা সাগর সৈকতে ভ্রমণের আনন্দ এনে দেবে। চাঁদনী রাতে অপূর্ব জ্যোৎস্না যখন এসব চরের বুকে নেমে আসে তখন এক অপার্থিব দৃশ্যের সূচনা হয় এখানে।

বীর যোদ্ধাদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ “রক্তধারা”

মোলহেডের প্রবেশ মুখেই রয়েছে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হওয়া বীর যোদ্ধাদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ “রক্তধারা”। বেশ খানিকটা দূর থেকেই চোখে পড়ে এটি। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে এই শহরে পাকবাহিনীর কয়েকটি টর্চার সেলের একটি ছিল এই বড় স্টেশন সংলগ্ন এলাকায়। নির্যাতিত অসংখ্য নারী-পুরুষের শেষ ঠিকানা হতো এই মোলহেড। নৃশংস নির্যাতনের পর তাদেরকে জীবিত অথবা মৃত সরাসরি নিক্ষেপ করা হতো এই মোহনায়।

কিভাবে যাবেন :

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এখানে বেড়াতে আসে। ঢাকা থেকে নৌ পথে লঞ্চে চাঁদপুরের দুরত্ব ৪ ঘণ্টা। ঢাকা থেকে দিনে এসে দিনেই ফিরে যাওয়া যায়। ঢাকার সদরঘাট লঞ্চস্টেশন থেকে চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত এক ঘণ্টা পর পর লঞ্চ ছাড়ে। একইভাবে চাঁদপুর থেকেও ঢাকার উদ্দেশ্যে লঞ্চ ছেড়ে যায়। ঢাকা-চাঁদপুর রুটে চলাচলকারী লঞ্চের মধ্যে এমভি সোনারতরী, এমভি তাকওয়া, এমভি বোগদাদীয়া, এমভি মেঘনা রাণী, এমভি আল বোরাক, এমভি ঈগল, এমভি রফরফ, এমভি তুতুল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বন্দর নগরী নারায়ণগঞ্জের সঙ্গেও চাঁদপুরের রয়েছে সরাসরি লঞ্চ যোগাযোগ।
এ ছাড়া রয়েছে ঢাকা-চাঁদপুর বাস সার্ভিস। ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল হতে প্রতিদিন সকাল ৬ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত পদ্মা এক্সক্লুসিভ বাস চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। আর চাইলে ঢাকা হতে ট্রেনে চড়েও চাঁদপুরে আসতে পারবেন। এক্ষেত্রে ঢাকা হতে ট্রেনে লাকসাম এসে সেখান থেকে চাঁদপুর যেতে হবে। চাঁদপুর লঞ্চ ঘাট থেকে রিক্সা বা অটোরিক্সা ভাড়া করে সহজেই বড় স্টেশন তিন নদীর মোহনায় যেতে পারবেন।

কোথায় থাকবেন :

চাঁদপুর শহরে থাকার জন্যে মোটামুটি ভালো হোটেলের মধ্যে সদর হসপিটালের সামনে হোটেল গ্র্যান্ড হিলশা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া চাঁদপুরে কোর্ট ষ্টেশনের কাছে মোটামুটি মানের কিছু আবাসিক হোটেল পাবেন। এছাড়া চৌধুরী ঘাট বা নতুন ব্রিজের কাছে নদীর পাড়ে আরও কিছু মধ্যম মানের হোটেল রয়েছে।

কোথায় খাবেন :

উদর পুত্তির জন্যে চাঁদপুরে বিভিন্ন মানের বেশকিছু খাবার হোটেল রয়েছে। আপনার পছন্দমত যেকোন হোটেলে খাবার খেয়ে নিতে পারবেন। তবে সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার খেতে চাইলে চাঁদপুর লঞ্চ টার্মিনালের ডান পাশে অবস্থিত বিআইডবিøউটিএ ক্যান্টিনে ঢুঁ মারতে পারেন। ইলিশের রাজধানী চাঁদপুরে বসে তাজা ইলিশের স্বাদ নিতে চাইলে বড় স্টেশনের ঝুপড়ি হোটেল অথবা লঞ্চঘাট সংলগ্ন হোটেলগুলোতে খেতে পারেন। তবে ফরিদগঞ্জের আউয়াল ভাইয়ের মিষ্টি এবং ওয়ান মিনিট আইসক্রিম এর স্বাদ নিতে ভুলবেন না যেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *