সর্বশেষ :

হামহাম ঝর্ণা, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার

বন সুন্দরী হামহামের উদ্দাম নৃত্য দেখতে হলে আসতে হবে বর্ষাকালে

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি :

ময়ূর যেমন বর্ষায় তার পেখম মেলে, বৃষ্টিভেজা কদম যেমন তার সুরভী ছড়ায়, বুনো ঝর্ণাও ঠিক তেমনি বর্ষার আলিঙ্গনে দুরন্ত যৌবনা হয়ে ওঠে। তাই বর্ষা হচ্ছে যৌবনবতী ঝর্ণার উদ্দাম নৃত্য দেখার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা যে কয়টি অনিন্দ্য সুন্দর ঝর্ণা আেেছ মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার হামহাম ঝর্ণা তাদের অন্যতম। অত্যন্ত দুর্গম আর গভীর জঙ্গলে অবস্থিত এই মায়াবী ঝর্ণা বহুকাল লোকচক্ষুর অন্তরালে আত্মগোপনে ছিল। কিন্তু প্রকৃতিপ্রেমী অনিসন্ধিৎসু মানুষের কৌতুহলের কাছে হার মেনে শেষ পর্যন্ত অবগুণ্ঠন ঘোচাতে বাধ্য হয়েছে আত্মগোপনে থাকা এই বন সুন্দরী।

প্রায় ১৫০ ফুট উপর হতে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ জলরাশি আছড়ে পড়ছে বড় বড় পাথরের গায়ে। সেই জল থেকে সৃষ্ট জলকণা তৈরি করছে কুয়াশার আবরণ। নয়নাভিরাম এ দৃশ্য দেখতে পাবেন হামহাম ঝর্ণায় বেড়াতে গেলে।

চা বাগানের ভিতর দিয়ে হামহাম যাওয়ার রাস্তা।

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলা থেকে প্রায় ৩৮ কি. মি. পূর্ব-দক্ষিণে রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গভীরে কুরমা বন বিটের শেষপ্রান্তে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। স্থানীয়ভাবে এটি চিতা ঝর্ণা নামেও সুপরিচিত। হামহামের উচ্চতা নিয়ে কিছুটা মতান্তর রয়েছে। কারো কারো মতে এর উচ্চতা ১৩৫ ফুট, কারো মতে ১৪৭ ফুট আবার কারো মতে ১৭০ ফুট। তবে প্রকৃত উচ্চতা যা-ই হোক না কেন, এটি যে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু ঝর্ণা – সে বিষয়টি সরকারিভাবে স্বীকৃত। ২০১০ সালের শেষ দিকে পর্যটন গাইড শ্যামল দেববর্মার সাথে দুর্গম জঙ্গলে ঘুরতে আসা একদল পর্যটক আবিষ্কার করেন এই বন সুন্দরীকে।

এই ঝর্ণার বুনো সৌন্দর্য দেখার জন্য অনেক কষ্ট স্বীকার করে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসে মানুষ। হামহাম পর্যন্ত পৌঁছানোর প্রতি পদে পদে যেমন রয়েছে বিপদের ভয়, তেমনি রয়েছে রোমাঞ্চের হাতছানি। সেই রোমাঞ্চের টানে হামহামের মোহনীয় সৌন্দর্যকে কাছ থেকে দেখার জন্যে প্রতিদিনই দীর্ঘ পাহাড়ের আঁকাবাঁকা উঁচু-নিচু গহীন অরণ্যের পথ বেয়ে আগমন ঘটছে বহু সংখ্যক পর্যটকের।
হামহাম যাওয়ার পথে দু পাশের বনের দৃশ্য যে কোন পর্যটককে মুগ্ধ করবে। বন, পাহাড় আর ঝিরি বেয়ে যাওয়ার পথে দেখা মিলবে নানা ধরনের গাছগাছালি আর পশু ও পাখির। ছোট ছোট পাহাড়ের গায়ে চা বাগান ছাড়াও দেখা যাবে সুপারি বাগান ও আনারসের জুম চাষ। রাজকান্দি বনাঞ্চলে রয়েছে সারি সারি কলাগাছ, জারুল, চিকরাশি ও কদমসহ নানা রকমের গাছপালা। এর ফাঁকে ফাঁকে পাখা মেলে রং-বেরঙের প্রজাপতি। ডুমুর আর বেত বাগানে দেখা মিলবে অসংখ্য চশমাপরা হনুমানের। এছাড়াও রয়েছে ডলু, মুলি, মির্তিঙ্গা, কালি ইত্যাদি বিচিত্র নামের বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ।

হামহাম যাওয়ার পথে বুনো সৌন্দর্য।

শ্রীমঙ্গল থেকে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট ও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানকে পাশ কাটিয়ে গাড়ী চলে যাবে সোজা চা বাগানের রাস্তা ধরে। পথে যেতে যেতে চোখে পড়বে জাহানারাপুর চা বাগান, মাধবপুর চা বাগান, শ্রী গোবিন্দপুর চা বাগান,কুরমা চা বাগান এবং চাম্পারায় চা বাগান। রাস্তা কখনো পিচ ঢালা, কখনো ইট বিছানো, আবার কখনো বা শুধু মাটির।

একে একে কুরমা বাজার, চাম্পারায় চা বাগান পার হয়ে আসতে হবে কলাবন পাড়ায়। চা শ্রমিকদের ছোট্ট গ্রাম কলাবন পাড়া। কলাবন পাড়া থেকে হামহাম ঝর্ণার দূরত্ব প্রায় ৭ কি.মি.। এই গ্রামের শেষপ্রান্ত থেকে রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চল শুরু। এই কলাবন পাড়া থেকে বনের মধ্য দিয়ে প্রায় আড়াই ঘন্টা ট্র্যাকিং করতে হবে। কলাবন পাড়া থেকে সঙ্গে গাইড নিয়ে নিতে হবে। পাথুরে পাহাড়ের ঝিরি পথে হেঁটে যেতে যেতে কানে ভেসে আসবে রকমারি পাখি আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। সেই সাথে আছে উল্লুকের চিৎকার। তবে এদের কেউই আপনাকে আক্রমণ করবে না, তাই নির্ভয়ে পথ চলুন। সময় গড়ানোর সাথে সাথে জঙ্গলও ঘন হতে থাকে। সুমধুর পাখির কলরব মনকে ভাললাগার অনুভূতিতে ভরিয়ে দেবে। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে একসময় পৌঁছে যাবেন আপনার কাঙ্খিত হামহাম ঝর্ণায়। ঝর্ণায় পৌঁছার আগেই দূর থেকে শুনতে পাবেন জলপ্রপাতের শব্দ।

হামহাম যাওয়ার পথে বুনো সৌন্দর্য।

বর্ষাকালে হামহামে যাবার কিছু আগে পথে দেখতে মিলে আরেকটি ছোট ঝর্ণার। হামহাম ঝর্ণার রয়েছে দুটো ধাপ। সর্বোচ্চ ধাপটি থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে মাঝখানের ধাপে, সেখান থেকে আবার নিচের অগভীর খাদে।

কলাবন পাড়া থেকে হামহাম যাওয়ার জন্য বনের ভেতর রয়েছে দুটি পথ। বনের শুরুতেই হাতের ডানে ও বায়ে পাশাপাশি দুটির অবস্থান। একটা দিয়ে যাবেন এবং আরেকটা দিয়ে আসবেন, তাহলে দুটি পথই দেখা হয়ে যাবে। ডানের পথ দিয়ে ঢুকে বায়ের পথ দিয়ে ফিরে আসবেন এটাই ভালো। কারণ, ডানের পথটা দীর্ঘ এবং অনেকগুলো উঁচু টিলা পেরোতে হয়, যা ফেরার পথে পরলে খুব কষ্ট হবে। তাই প্রথমে কষ্ট হলেও আসার সময় একটু আরাম করে আসবেন। ফেরার পথ কম না, তবে টিলা কম পেরোতে হয়।

কলাবন পাড়া থেকে হামহাম পর্যন্ত পৌঁছতে ছোট বড় কয়েকটি পিচ্ছিল টিলা পাড়ি দিতে হয়। এই পথে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নেয়ার জন্য বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য দাঁড়ালেও আসবে বিপদ। সেই বিপদ আর কিছুই না, দাঁড়ানো মাত্রই চারপাশ থেকে আপনাকে ঘিরে ধরবে অসংখ্য জোঁক। সবাই বলে হামহামের পথ হচ্ছে জোকদের স্বর্গরাজ্য। এদের থেকে বাঁচতে চাইলে শরীরটাকে যতদূও সম্ভব কাপড় দিয়ে ঢেকে নিন। পায়ে জুতো বা উঁচু বুট পরলে ভালো। সাথে কেজি খানেক লবণ নিতে ভুলবেন না। সাবধানতা অবলম্বনের পরেও যদি জোঁক ধরে, তখন এই লবণই ভরসা। লবণ দিলে সাথে সাথেই জোঁক ছেড়ে দেবে।

কীভাবে যাবেন:

ঢাকার সায়েদাবাদ, কমলাপুর, আরামবাগ থেকে হানিফ, শ্যামলী, মামুন, ইউনিক ইত্যাদি পরিবহনে অথবা কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে সিলেটগামী ট্রেনে করে শ্রীমঙ্গল এসে নামতে হবে। শ্রীমঙ্গল নেমে হোটেল নিয়ে নিলে ভাল করবেন। যদি রাতের গাড়ীতে আসেন তবে শ্রীমঙ্গল থেকে নাস্তা কওে সকাল ৯টার মধ্যে রওনা হতে হবে। আর যদি দিনের গাড়ীতে রওনা হন তবে রাতে হোটেলে থেকে ভোরে হামহাম চলে যাবেন এবং পথে কুরমা বাজারে নাস্তা সেরে নিবেন। শ্রীমঙ্গলে হোটেলের আশেপাশে অনেক অটোরিক্সা পাবেন, এতে চড়ে শ্রীমঙ্গল থেকে প্রথম কলাবন পাড়া যেতে হবে, ড্রাইভারকে হামহাম যাব বললেই হবে। আপ-ডাউন ১,৫০০ টাকার মতো নিবে। কলাবন পাড়া পৌঁছে আপনাকে গাইড নিতে হবে। ওখানকার চা শ্রমিকরাই ২০০/৩০০ টাকার বিনিময়ে গাইডের কাজ করে। গহীন পাহাড়ি বনের ভিতর দিয়ে প্রায় আড়াই ঘন্টা হাঁটতে হবে। বর্ষাকালে অনেক পানি থাকলেও শীতকালে পানি থাকে কম। উঁচু পাহাড়ে উঠতে হবে, তাই সাবধান থাকতে হবে। সাথে অবশ্যই রাস্তা থেকে লাঠি নিবেন, ৫ টাকা নেবে। লবন বা গুল নিবেন জোঁকের জন্যে। আসা-যাওয়া নিয়ে প্রায় ৫ ঘন্টা হাঁটতে হবে। শ্রীমঙ্গল ফিরে এসে রাতে হোটেলে থেকে যেতে পারেন অথবা ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে রাতেই ঢাকা রওনা হতে পারেন।

কোথায় থাকবেন :

শ্রীমঙ্গলে বেশ কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। যেমন- হোটেল প্লাজা – ০৮৬২৬-৭১৫২৫, টি রিসোর্ট -০৮৬২৬-৭১২০৭, বি.টি.আর.আই – ০৮৬২৬-৭১২২৫ ইত্যাদি। এছাড়াও কমদামি কিছু হোটেলও আছে যেখানে থাকতে পারেন। খরচ পরবে ৫০০/৮০০ টাকা। তবে হামহাম ঝর্ণা এলাকার আশেপাশে থাকার মতো তেমন ভালো কোন ব্যবস্থা নেই। তবে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারলে তৈলংবাড়ী কিংবা কলাবন পাড়াতে আদিবাসীদের ঘরে থাকতে পারেন।

ভ্রমণ টিপস্ :

মনে রাখবেন অব্যবহৃত খাবার, চিপসের প্যাকেট, সিগারেটের ফিল্টার, পানির বোতলসহ অন্যান্য আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলবেন না। এগুলি সাথে করে নিয়ে আসবেন এবং বনের বাইরে এসে কোথাও ফেলবেন। জোঁক ছাড়ানোর জন্য সাথে লবণ বা গুল রাখবেন। জোঁক কামড়ালে হাত দিয়ে টেনে ছাড়াতে যাবেন না, লবণ/গুল ছিটিয়ে দিলেই ছেড়ে যাবে।
ঝর্ণায় যাওয়ার পথে বেশ কিছু উচু নিচু পাহাড়, বন, পিচ্ছিল এলাকা পার হতে হবে তাই সতর্ক হয়ে পথ চলবেন। মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ওই দুর্গম রাস্তা পাড়ি দিয়ে ফিরে আসা অনেক কঠিন হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *