সর্বশেষ :
অবাধ্য পর্যটক ঠেকাতে মাউন্ট ফুজিতে দেয়াল তুললো জাপানপর্যটন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ – ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামদুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কবলে পড়ে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের এক যাত্রীর মৃত্যুঅবশেষে কক্সবাজার ফিরছেন সেন্টমার্টিনে আটকাপড়া পর্যটকরাবিদেশি পর্যটকদের ক্যাসিনোসহ বিনোদন নিশ্চিতের সুপারিশপর্যটকদের বিস্ময় শমশেরনগরের ক্যামেলিয়া লেকপদ্মাসেতুকে ঘিরে পর্যটন খাতে নেওয়া হয়েছে নানা কর্মসূচিপর্যটন ভবনের ছাদে রুফটপ রেস্টুরেন্ট উদ্বোধন করলেন পর্যটন প্রতিমন্ত্রীসেন্টমার্টিন ভ্রমণে নতুন বিধি-নিষেধ আরোপনতুন বিমান ‘ধ্রুবতারা’র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

শুভলং ঝর্ণা , রাঙামাটি

ছন্দ সেন চাকমা, রাঙামটি প্রতিনিধি :
অনাবিল সৌন্দর্যের এক নিটোল আধার হচ্ছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটি। তাই রাঙামাটি পর্যটকদের কাছে অতি প্রিয় একটি নাম। রাঙামাটি বেড়াতে এসেছেন অথচ শুভলং ঝর্ণা দেখেননি এমন মানুষ বোধহয় খুব একটা পাওয়া যাবে না। পর্যটকদের কাছে টানতে রাঙামাটির যে কয়টি মূল আকর্ষণ, তার মধ্যে শুভলং ঝর্ণা অন্যতম।
রাঙ্গামাটি সদর হতে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরত্বে শুভলং বাজারের পাশেই এই ঝর্ণার অবস্থান। বাংলাদেশের অন্য সকল ঝর্ণার মত শুভলং ঝর্ণাতেও শুকনো মৌসুমে পানি খুব কম থাকে। বর্ষা মৌসুমে এর প্রকৃত রূপ দেখা যায়। তখন প্রায় ১৪০ ফুট উঁচু পাহাড় থেকে বিপুল জলরাশি আছড়ে পড়ে কাপ্তাই লেকে ।
এ ঝর্ণার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো, একক কোনো ধারায় না পড়ে এই ঝর্ণাটি তার উঁচু অবস্থান থেকে ছোট ছোট বেশ কয়েকটি ধারায় বিভক্ত হয়ে একই সমান্তরালে নেমে আসে। ফলে ঝর্ণা থেকে পড়া পানির ধারাটি এক অপূর্ব সৌন্দর্যের জন্ম দেয়।
পাহাড়ের উপর থেকে পাথুরে মাটিতে ঝর্ণাধারার আছড়ে পড়ার অপূর্ব দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। অতিরিক্ত কাপড় সাথে থাকলে ঝর্ণার শীতল জলে স্নান করে শরীর জুড়িয়ে নিতে পারেন। শুভলং ঝর্ণা থেকে একটু সামনে এগিয়ে শুভলং বাজারের কাছেই রয়েছে প্রায় ২,০০০ ফুট উঁচু ‘শুভলং পাহাড়’ বা ‘টি এন্ড টি পাহাড়’। পাহাড় চূড়ায় রয়েছে একটি সেনাক্যাম্প ও টিঅ্যান্ডটি টাওয়ার। পাহাড়ে ওঠার জন্য রয়েছে চমৎকার সিঁড়ি। পাহাড়ের উপর থেকে দেখলে মনে হবে সমস্ত রাঙামাটি জেলা যেন কাপ্তাই লেকের পানির উপর ভাসছে।

শুধু শুভলং ঝর্ণাই নয়, এর যাতায়াতের পথটিও বেশ রোমাঞ্চকর। শুভলং ঝর্ণায় যাওয়ার পথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনাকে এতটাই মুগ্ধ করবে যে, মনে হবে বার বার ফিরে আসি। মাথার উপর ঝকঝকে নীল আকাশ, নীচে স্বচ্ছ নীল জলরাশি, পাশে সবুজ পাহাড়ের মায়াবী হাতছানি। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ঘরবাড়ি। মনে হবে শিল্পীর নিপুণ হাতের তুলির টাকে আঁকা এক জলছবি।
কাপ্তাই লেক ধরে শুভলং ঝর্ণায় যাওয়ার পথে দেখা যাবে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য। নদী থেকে মাছ তুলে জ্যান্ত মাছ ডিঙি নৌকায় ফেলছেন জেলেরা। আর পাহাড়ি মেয়েরা কাজ শেষ করে বৈঠা টানা নৌকা নিয়ে পাড়ি দিচ্ছে কাপ্তাই লেক।

সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পরতে থাকে লেকের নীল জল তখন আরও চিক চিক করে উঠে। পাহাড় থেকে সবুজ গাছের গা বেঁয়ে মৃদু বাতাস এসে শরীরটাকে জুড়িয়ে দেয়। আর বিকেলে ঝর্ণা দেখে ফেরার সময় সিঁদুরে লাল আকাশ আপনার চোখ ধাঁধিয়ে দেবে। রাতে পূর্ণিমার চাঁদের আলো যখন ঝিলের জলে এসে পড়ে তখন মায়ারী নীল জ্যোৎস্নায় চরাচর ভেসে যায়। অপার্থিব এক অনুভূতিতে দেহ-মন তখন দুলতে থাকে। এ সৌন্দর্য শুধু প্রাণভরে উপভোগ করা যায়, মুখের ভাষা দিয়ে হৃদয়ের অনুভূতিকে মূর্ত করে তোলা যায় না।

কোথায় খাবেন, কী খাবেন
হ্রদের কূলে পাহাড়ের গাছাপালার ফাকে পর্যটনের কুড়েঘর। রাঙামাটির অদূরে ‘পেদা টিং টিং রেস্তোরাঁ বা হোটেল। এখানে শুধু সপরিবারে থাকা যায়। পেদা টিং টিং অর্থ পেট টইটম্বুর। এখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিজস্ব রান্না আছে। সাবেরাং দিয়ে ভর্তা বা মাংস, বাঁশের চোঙায় ভর্তা টাকি মাছ, বাঁশের কোড়ের অপূর্ব রান্না। কলাপাতায় মোড়া বদাখোলা, তেল-মসলা ছাড়া শাক ও তরকারী রান্না। নাপ্পি দিয়ে ভর্তা ও তরকারী আছে। হরিণের শুকনো মাংস রান্না খেয়েছেন? মোষের শুকনো চামড়ার বিশেষ রান্না? শিমুল ফুল রান্না? পাকা বেগুনের সুস্বাদু তরকারি? তেল-ঝাল ছাড়া উচ্ছে শাক, মূলার কচি ফুল ও বীজ, আস্ত মূলা সেদ্ধ, শামুক ও কাকড়া লেলম পাতা সেদ্ধ, মারফা (এক রকম শশা), জুমের মিষ্টি ভুট্টা সেদ্ধ, বাঁশের চোঙায় রান্না ঘন লাল ও ঘন কালো বিন্নি চালের ভাত? অথবা ভাপে রান্না (যাকে স্মোকড রান্না বলে) বিন্নিভাত? বাঁশের চোঙায় পাতা মোষের দই? বিন্নি চালের মিষ্টি জগরা? ঝাঁঝালো এক রকম পাতার শাক? ওদের রান্নায় তেল ও মশলা নেই। চিংড়ি শুটকির অপূর্ব ব্যবহার জানে ওরা। অনেক রকম কচু ও আলু আছে ওদের। বাহারী এত শাক-সবজি আছে যে, সেই স্বাদের বর্ণনা আমি এখানে দিতে পারব না।

যেভাবে যেতে হবে
রাঙামাটি শহর থেকে ইঞ্জিন বোটে শুভলং যেতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘন্টা। রিজার্ভ বাজার, তবলছড়ি বাজার এবং পর্যটন কমপ্লেক্স থেকে ইঞ্জিন বোট ভাড়া পাওয়া যায়। যাওয়া আসার ভাড়া ৭০০- ১৫০০ টাকা। যেতে পারবেন ১০ থেকে ২০ জন। বোটে করে শুভলং যাওয়ার আনন্দটাই অন্যরকম। সম্প্রতি চালু হয়েছে এই পথে আধুনিক জলযান কেয়ারী কর্ণফুলী। এছাড়া রিজার্ভ বাজার থেকে সকাল থেকে দুপুরের পর পর্যন্ত লোকাল লঞ্চ ছাড়ে বিভিন্ন গন্তব্যে। সকালে উঠলে ফিরতি পথেও পেয়ে যাবেন কোনো লঞ্চ। ঘুরে আসতে পারেন সেসব কোনো লঞ্চেও। শুভলং যতো না সুন্দর, তার চেয়ে আরো সুন্দর এর যাওয়ার পথটি। দু’পাশে উঁচু পাহাড় তার মাঝ থেকে নিরবধি বয়ে চলা কাপ্তাই লেক।

কোথায় থাকবেন
থাকার জন্য রাঙ্গামাটিতে সবচেয়ে ভাল জায়গা হচ্ছে পর্যটন মোটেল। সরকারী-বেসরকারী অনেকগুলো হোটেল এবং গেষ্ট হাউজ রয়েছে এখানে। এছাড়াও থাকার জন্য কিছু বোডিং পাওয়া যায় এখানে। বোডিংগুলোতে খরচ কিছুটা কম তবে থাকার জন্য খুব একটা সুবিধার নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *