সর্বশেষ :

করোনা পরবর্তি বিশ্বে কেমন হবে আবাসিক হোটেল ব্যবস্থাপনা

ট্রাভেলার নিউজ ডেস্ক :

বিশ্ব্যব্যাপি চলা করোনা ঝড় থেমে গেলেও তার তান্ডবে বিপর্যস্ত পর্যটন শিল্পের ক্ষত সারতে সময় লাগবে বেশ। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হবে এই সেক্টরে। স্পা কিংবা বুফে আয়োজনকে আপাতত বিদায় জানাতে হবে। আবার স্বাগত জানাতে হবে জীবাণুমুক্ত স্প্রে ও তাপমাত্রা মাপার যন্ত্রকে।

ক’দিন আগেও আমরা সবাই মিলে বেড়াতে যাওয়া পরিকল্পনা করতাম, দেশে কিংবা দেশের বাইরে। কাজের প্রয়োজনে নতুন কোথাও বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলেও মনে কাজ করত এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি।

বেড়ানো হোক কিংবা কাজ, নতুন কোথাও গিয়ে রাত্রিযাপনের জন্য আবাসিক হোটেলের বিকল্প খুব কমই থাকে। আবার হোটেলগুলোও তাদের অতিথিদের জন্য রাখে বিভিন্ন বিলাসি আয়োজন – যা ঘরেও হয়ত পাওয়া সম্ভব নয়। বুফে খাবার, সুইমিং পুল, স্পা, ক্যান্ডেল লাইট ডিনার, বার-বি-কিউ পার্টি ইত্যাদি তো আছেই।

বিলাসবহুল হোটেলগুলোতে থাকে চোখ ছানাবড়া হওয়ার মতো আরও কত বিলাসি আয়োজন। তবে করোনাভাইরাসের বিষাক্ত ছোবলে তার সবই এখন গুড়ে বালি।

‘কোভিড-১৯’র এই ভয়াবহ সময়ে ঘর থেকে বের হওয়াই যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে পর্যটন খাতের ওপর কতবড় ধকল যাচ্ছে তা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। তবে এর মাঝেও বিশ্বব্যাপী ছোটবড় আবাসিক হোটেলগুলো বর্তমান পরিস্থিতি মাথায় রেখে তৈরি করছে নতুন নিয়ম। এরপর কোনো হোটেলে থাকতে গেলে অনেক পরিবর্তন চোখে পড়বে সেকথা অনিবার্য।

এই বিষয়ের ওপর সিএনএন ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউভার্সিটি’র ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক ক্রিস্টোফার অ্যান্ডারসন বলেন, “কোভিড-১৯’র টিকা, চিকিৎসা কিংবা তাৎক্ষণিক পরীক্ষা সহজলভ্য না হওয়া পর্যন্ত আবাসিক হোটেলগুলোর অনেক সুযোগ-সুবিধাই বন্ধ থাকবে, বিশেষত বিলাসবহুল হোটেলগুলোতে। অনেক মানুষ একসঙ্গে বসে আনন্দ করা, খাওয়ার মত বিলাসি সুবিধাগুলো হারিয়ে যাবে অনেকটাই।”

তিনি আরও বলেন, “অতিথিরাও এই নতুন নিয়মগুলো মেনে নেবেন, এমনকি সুবিধাগুলো থাকলেও হয়ত কেউ তার ধারে কাছে যাবেন না। কাজের প্রয়োজনে কিংবা অবসর কাটাতে এসে অন্য মানুষের সঙ্গে মেলামেশা ছাড়াই ভাড়া নেওয়া ঘরটিতে যাতায়াত করতে চাইবে মানুষ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং জীবাণুমুক্ত একটু মাথা গোজার ঠাঁই হয়ত হয়ে দাঁড়াবে একমাত্র কাম্য।

লকডাউন শিথিল হওয়া দেশগুলোতে ক্রমে আবাসিক হোটেলে অতিথির সংখ্যা বাড়ছে, তবে স্বভাবতই তা গতবছরের এই সময়ের তুলনায় অনেক কম। তারপরও অতিথিরা যেহেতু আসছেন তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের নামকরা হোটেলগুলো বিভিন্ন সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখছেন।

যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে

যুক্তরাষ্ট্রে ‘আমেরিকান হোটেল অ্যান্ড লজিং অ্যাসোসিয়েশন’ গত সোমবার প্রকাশ করেছে পুরো শিল্পখাতের প্রযোজ্য ‘স্টে সেফ স্ট্যান্ডার্ডস’। পিছিয়ে নেই বড় মাপের হোটেল গ্রুপগুলোও।

মায়ো ক্লিনিক’র ‘ইনফেকশন প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল টিমের সহযোগিতায় হোটেল বেহিমথ হিলটন কাজ করছে ‘ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক স্প্রেয়ারস’ নিয়ে – যা স্বাধীনভাবে বিস্তৃত এলাকাজুড়ে তৈরি করবে জীবাণুনাশকের কুয়াশা। বিভিন্ন সমতল আর বস্তু জীবাণুমুক্ত করতে অতিবেগুনি রশ্মিকে কাজ লাগানোর চেষ্টাও করছেন তারা।

অপরদিকে ‘ম্যারিয়ট’ ইতোমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে তারা ‘গেস্ট রুম’ ও জনসমাগম হওয়া সাধারণ স্থানগুলোতে ‘ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক স্প্রেয়ারস ব্যবহার করবেন, অতিবেগুনি রশ্মি নিয়ে তারাও কাজ করছেন। এছাড়াও তারা আসবাবপত্রের অবস্থান পরিবর্তন করে অতিথিদের মধ্যে ছয় ফুট দূরত্ব নিশ্চিত করবে। ফ্রন্ট ডেস্কে হোটেল কর্মী আর অতিথিদের মধ্যে দূরত্ব রাখতে ব্যবহার করবে ‘প্লেক্সিগ্লাস’।

ম্যারিয়ট’য়ের বিশ্বজুড়ে থাকা ৩২০০টি হোটেলে অতিথিরা ‘চেক-ইন’, ঘর তালা খোলা কিংবা বন্ধ করা এবং বিশেষভাবে প্যাকেট করা ‘রুম সার্ভিস’ নিতে পারবেন মানুষের সংস্পর্শে না এসেই, নিজেদের মোবাইলের মাধ্যমে।

লাস ভেগাসের ‘দ্য ভেনিশিন’ হোটেলসহ আরও অনেক হোটেল বিশেষ চিহ্নের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে দূরত্ব নিশ্চিত করবে। ডেস্ক, লিফ্ট, লবি, রেস্তোরাঁ, বিনোদন কেন্দ্র ইত্যাদি সবখানেই থাকবে এই চিহ্নগুলো। কর্মীদের কাজের স্থানও থাকবে অন্য কর্মী থেকে নিরাপদ দূরত্বে। ‘স্লট মেশিন’, রেস্তোরাঁর টেবিল, ‘পুল লাউঞ্জারস’ ইত্যাদিও ছয় ফুট দূরত্ব মেনে চলার নিয়ম অনুযায়ী বসানো হবে।

লিফ্টে একসঙ্গে কয়জন উঠতে পারবেন সেখানেও নিয়ম করে দেওয়া হচ্ছে। কোথাও দুজন তো কোথাও সর্বোচ্চ চারজন। সম্ভাব্য এবং নিশ্চিত ‘কোভিড-১৯’ রোগীদের জন্য আলাদা পরিকল্পনা থাকবে এই স্থানগুলোতে।

অতিথিদের স্ক্যানিং

অতিথিদের শারীরিক তাপমাত্রা মাপা প্রায় সবখানেই সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে হোটেলগুলোতে তার ব্যবহার কতটা থাকবে তা এখনও অনিশ্চিত।

‘দ্য ভেনিশিন’ তার সকল প্রবেশদ্বারে ‘থার্মাল স্ক্যানার ব্যবহার করবে, অতিথি ও হোটেল কর্মী সবাই ‘স্ক্যানিং’য়ের আওতাভুক্ত হবে।

সিঙ্গাপুর হাতে নিয়েছে ‘এসজি ক্লিন’ নামক প্রকল্প যার আওতায় আছে সকল ব্যবসায়িক খাত। হোটেলের আদর্শ ধারায় দেওয়া হয়েছে- অতিথিদের শারীরিক তাপমাত্রা পরিমাপ করতে হবে যদি সম্ভব এবং কার্যকর হয়।

নিউ ইয়র্কের ‘দ্য ফোর সিজন্স’ স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিতদের সেবা দেওয়া শুরু করে এপ্রিলে। ‘ইন্টারন্যাশনাল এসওএস’ নামক এক পর্যটন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া নীতি অনুসরণ করছে তারা।

সেই নীতির প্রবর্তক, ‘ইন্টারন্যাশনাল এসওএস’য়ের ‘সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট’ এবং ‘রিজিওনাল মেডিকল ডিরেক্টর ডা. রবার্ট কুইগলির মতে, “ভবনের প্রবেশপথ থাকছে একটি যা সবাইকে ব্যবহার করতে হবে। সেই প্রবেশপথে প্রবেশকারীদের শরীরের তাপমাত্রা নেওয়া হবে এবং নার্সদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকবে সেই প্রবেশপথ। তবে ‘অ্যাসিম্পটোম্যাটিক ট্রান্সমিশন’ ঠেকাতে হলে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে। হোটেলে অতিথিদের ‘স্ক্রিনিংয়ের উন্নয়ন হবে ‘র‌্যাপিড টেস্টিং কিট’র সহজলভ্যতার ভিত্তিতে।”

অতিথিদের সুরক্ষিত রাখতে আসলেই কী করণীয়?

‘ফোর সিজন্স নিউ ইয়র্ক’য়ের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক রুডি টাউসার ভাবছেন ‘চেক-ইন’ আর ‘চেক-আউটের সময় ভিন্নতা নিয়ে। অনেকসময় সকালে যে ঘরটি খালি হয়, সন্ধ্যায় সেই ঘরেই আরেকজন অতিথি আসেন। এই যাওয়া আসার মাঝখানে নির্দিষ্ট একটা সময় ব্যবধান, যেমন ২৪ ঘণ্টা কী উপকারী হতে পারে ?”

তিনি আরও বলেন, “খরচের দিকটাতেও নজর দিতে হয়, কাজের ধারা নিয়েও ভাবতে হয়।”

‘ফোর সিজন্স নিউ ইয়র্ক’ যখন চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিতদের সেবা দেওয়া শুরু করে, তখন তারা ‘ইন্টারন্যাশনাল এসওএস’য়ের দেওয়া নীতি অনুযায়ী লম্বা সময় একটি ঘর খালি রেখে তা একাধিকবার পরিষ্কার করে সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। তবে সেটা একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সমাধান ছিল। সাধারণ মানুষের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে থাকা তাদের হোটেলগুলো যখন দুয়ার খুলবে তখন নতুন কোন্ নীতি অনুসরণ করা যায় সেটা নিয়ে ভাবছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠানটির ‘প্রেসিডেন্ট অফ গ্লোবাল অপারেশন্স’ ক্রিশ্চিয়ান ক্লার্ক বলেন, “ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে হোটেলের চাহিদা বাড়বে, বদলাবে অতিথিদের চাহিদা এবং সেই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে নতুন পথ নিয়ে আমরা প্রস্তুত থাকবো।”

স্পর্শ আর সেবার ভবিষ্যত

করোনাভাইরাসের প্রকোপের কারণে বহুজনের স্পর্শ পায় হোটেলের এমন অংশগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন আসা জরুরি হয়ে উঠেছে। কে কী স্পর্শ করছে সেটা এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, তাই রুম সার্ভিসে সীমাবদ্ধতা আসবে। সবধরনের বাফেটে নিষেধাজ্ঞা আসবে।

আবার সবার মাঝেই সংক্রমণের ভয় কাজ করবে। ফলে এই সুবিধাগুলো যতই নিরাপদ হোক না কেনো মানুষ সংক্রমণের আতঙ্কে তার প্রতি আকর্ষণ হারাবে। আগেভাগেই প্যাকেট করে রাখা খাবার, যা নিয়েই মানুষ নিরাপদ স্থানে চলে যাবে সেটাই হয়ত নতুন স্বাভাবিক ঘটনা হতে যাচ্ছে।

ব্যায়ামাগার আর স্পা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হয়ে উঠবে। কারণ এখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব বলা চলে। অসংখ্য দরজার হাতল এখন থেকে অনেক যত্ন সহকারে পরিষ্কার রাখতে হবে প্রতিমুহূর্তে।

সব দিক দিয়ে বিবেচনা করে নতুন করে আস্থা ফেরাতে হোটেলগুলোকে অনেক কাঠ-খর পোড়াতে হবে। আর সবার মাঝে সেই আত্মবিশ্বাস কবে ফিরবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *